Shadin Pratidin
প্রকাশ : Feb 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

“ইনকিলাব”: একটি শব্দের যাত্রা, একটি জাতির চেতনা

শব্দ কখনো কেবল শব্দ থাকে না; সময়, সংগ্রাম ও মানুষের রক্তমাখা ইতিহাস তাকে প্রতীকে রূপ দেয়। “ইনকিলাব”—এমনই এক শব্দ, যার ধ্বনিতে কাঁপে ভাষা, জাগে ইতিহাস, এবং পুনর্লিখিত হয় রাজনীতির অভিধান।

“ইনকিলাব” (انقلاب) শব্দটির উৎস আরবি—ধাতু ক্বালাবা (ق-ل-ب), যার অর্থ উল্টে দেওয়া, রূপান্তর, মৌলিক পরিবর্তন। প্রাচীন আরবি অভিধান Lisān al-ʿArab-এ “ইনকিলাব” মানে অবস্থার আমূল পরিবর্তন বা উলটপালট। ফার্সিতে এটি “এনকেলাব” রূপে প্রবেশ করে, আর উর্দু ভাষায় এসে পায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত। Farhang-e-Asfia-র মতো অভিধানে এর অর্থ—মৌলিক পরিবর্তন, শাসনব্যবস্থার উলটপালট, বিপ্লব। ভাষার এই ভ্রমণ একদিন ইতিহাসের মোড়ে এসে দাঁড়ায়।

উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে উর্দু-ফার্সি কবি মাওলানা হাসরাত মোহানির কবিতায় “ইনকিলাব” হয়ে ওঠে সামাজিক পরিবর্তনের রূপক। কিন্তু শব্দটি যখন সরাসরি রাজনৈতিক স্লোগানে রূপান্তরিত হয়, তখন তার অভিঘাত বহুগুণ বেড়ে যায়। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯২১ সালে আহমেদাবাদে কংগ্রেস অধিবেশনে হাসরাত মোহানি “Inquilab Zindabad” স্লোগান উচ্চারণ করেন এবং পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে সরব হন। তাঁর কণ্ঠে “ইনকিলাব” ছিল কেবল শাসন পরিবর্তনের আহ্বান নয়; ছিল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ছিন্ন করার সংকল্প।

মোহানি কেবল রাজনৈতিক কর্মী নন—তিনি ছিলেন এক গভীর সংবেদনশীল কবি। তাঁর জনপ্রিয় গজল “Chupke Chupke Raat Din Aansoo Bahana Yaad Hai” উর্দু সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চারণ। প্রেম ও বেদনার ব্যক্তিগত স্বর সেখানে যেমন প্রবল, তেমনি নীরব প্রতিরোধেরও এক অন্তর্লীন সুর আছে। এই দ্বৈত সত্তাই তাঁকে অনন্য করে—যে মানুষ প্রেমের অশ্রু নিয়ে লিখতে পারেন, তিনিই আবার অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে “ইনকিলাব” উচ্চারণ করেন। ফলে শব্দটি তাঁর হাতে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; হয়ে ওঠে মানবিক বোধেরও সম্প্রসারণ।

ইতিহাসের আরেকটি মোড় আসে ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল। দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পর ও তাঁর সহযোদ্ধারা “Inquilab Zindabad” স্লোগান উচ্চারণ করেন। আদালতকক্ষ, সংবাদপত্র ও জনসমক্ষে এই ধ্বনি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সর্বভারতীয় বিপ্লবী চেতনার প্রতীকে। ভগত সিং স্লোগানটির উদ্ভাবক নন—কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ ও দৃঢ় অবস্থান শব্দটিকে জনমানসে অমর করে তোলে।

এরপর “ইনকিলাব” আর কোনো একক রাজনৈতিক ধারার সম্পত্তি থাকেনি। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলন, পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষ্যে—এই শব্দটি বারবার ফিরে এসেছে। কখনো ন্যায়বিচারের আহ্বানে, কখনো গণআন্দোলনের শ্লোগানে, কখনো সাহিত্যিক রূপকে।

বিশেষত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে “ইনকিলাব” শব্দটি নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে আবারও উচ্চারিত হয়েছে—কখনো স্লোগানে, কখনো ব্যানারে, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই উচ্চারণ কেবল ঐতিহাসিক অনুকরণ নয়; বরং অন্যায়, বৈষম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। লক্ষণীয় যে, আজকের তরুণেরা যখন “ইনকিলাব” বলেন, তখন তারা কেবল শাসন পরিবর্তনের কথা বলেন না—তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামোর দাবি তোলেন। অর্থাৎ শব্দটির অর্থ আবারও সময়োপযোগী হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে মোহানিকে নতুন করে চেনা জরুরি। তাঁর গজলের নীরব অশ্রু এবং তাঁর স্লোগানের উচ্চকণ্ঠ—এই দুই মিলেই গড়ে ওঠে এক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব। “চুপকে চুপকে…”–এর আবেগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিপ্লব কেবল রাস্তায় জন্ম নেয় না; তা জন্ম নেয় মানুষের অন্তরে, অপমানের স্মৃতি ও ন্যায়বোধের গভীর স্তরে। আর সেখান থেকেই একদিন তা পরিণত হয় “ইনকিলাব”-এ।

একটি শব্দের বিবর্তন আমাদের শেখায়—ভাষা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। যে শব্দের অর্থ ছিল “উলটপালট”, সেটিই একদিন হয়ে ওঠে ন্যায়, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার সমার্থক। তবে এও সত্য, “ইনকিলাব” কেবল শাসনব্যবস্থা পাল্টানোর ডাক নয়; এটি মূল্যবোধের রূপান্তরেরও আহ্বান। বাহ্যিক বিপ্লবের চেয়ে অন্তর্গত পরিবর্তনই স্থায়ী ইতিহাস নির্মাণ করে।

আজ যখন বাংলাদেশ নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন “ইনকিলাব” উচ্চারণ মানে শুধু আবেগ নয়—দায়িত্বও। কারণ প্রকৃত ইনকিলাব মানে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়; ধ্বংস নয়, পুনর্গঠন; অস্থিরতা নয়, সুশাসনের প্রতিশ্রুতি।

অতএব, “ইনকিলাব” একটি শব্দের চেয়ে বেশি কিছু—এটি সময়ের স্পন্দন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত আহ্বান। প্রশ্ন শুধু একটি: আমরা কি সেই আহ্বানকে কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি তা নৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি করে তুলব?

কলাম লেখক: কবি ও সাংবাদিক আজাদুল হক আজাদ
তথ্যসূত্র: আরবি ও উর্দু প্রামাণ্য অভিধান (যেমন Lisān al-ʿArab, Farhang-e-Asfia), ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনবিষয়ক গবেষণা ও ঐতিহাসিক দলিল সমূহ থেকে।

📰 আরও খবর জানতে ভিজিট করুন:
      www.shadinpratidin.com
💬 মতামত দিন | 🔁 বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সীমিত আঘাত’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের, যেকোনো হামলাকে পূর

1

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

2

বিসিসির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করল নির্বাচন কমিশন

3

এআইইউবিতে চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত

4

উগ্রবাদী আচরণে নিরাপত্তা শঙ্কা: ভারতের বিশ্বকাপ ভেন্যু বদলাত

5

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের সরকার দরকার: আজিজুল

6

সাবের হোসেন চৌধুরীর গুলশান বাসভবনে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান তিন রাষ

7

স্থানীয় সরকার নয়, জাতীয় নির্বাচন আগে চায় বিএনপিসহ বিভিন্ন দল

8

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

9

পিকআপের ধাক্কায় পথচারী নিহত, চালক আটক

10

এক মহা জীবনের সমাপ্তি: আগামীর প্রেরণা

11

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক আর নেই

12

পুতিন-কিমের সঙ্গে চুক্তি চান ট্রাম্প

13

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

14

অবিবেচনাপ্রসূতভাবে ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে: দেবপ্রিয়

15

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড

16

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

17

উই উইল ব্রিং দ্য চেঞ্জ: বৈষম্যহীন ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশের প্

18

ফ্যাসিবাদপন্থী সাংবাদিকদের বিচারের দাবি বৈছাআ’র ৩২ সমন্বয়কের

19

বাড়ির দোতলায়ও পানি, ভাই–বোনের খোঁজ পাচ্ছেন না গায়িকা পুতুল

20