কারা হেফাজতে সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক | স্বাধীন প্রতিদিন
সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন গতরাতে কারা হেফাজতে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় এনেছে—কারাগারে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার এবং সেই মৃত্যুর পেছনের বাস্তব কারণ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে কারা হেফাজতে প্রতি মাসে গড়ে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাব বলছে—
• ২০২৪ সালে মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের,
• ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৯৫ জনের।
এই মৃতদের মধ্যে একটি বড় অংশই সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে প্রশাসনিক সুবিধা, রাষ্ট্রীয় প্রভাব ও আয়েশি জীবন যাপন করা এসব ব্যক্তি হঠাৎ করে কারাগারের কঠোর বাস্তবতায় এসে চরম মানসিক হতাশা ও ভাঙনের মধ্যে পড়ছেন—যার প্রভাব তাদের শারীরিক অবস্থার ওপরও পড়ছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বগুড়া জেলা কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় অন্তত চারজন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়। তারা ‘নাশকতা’ ও ‘হত্যা মামলার’ আসামি ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মৃত্যু হয়েছে ‘হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য অসুস্থতায়’। তবে পরিবারগুলো এসব ব্যাখ্যা মানতে রাজি হয়নি।
একজন নিহতের সন্তান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তার বাবা কখনো হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন না। কারাগারে সাক্ষাৎকালেও কোনো অসুস্থতার কথা তিনি বলেননি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এই মৃত্যুগুলো কি কেবল শারীরিক কারণে, নাকি হঠাৎ ক্ষমতা হারানো, সামাজিক পতন এবং কারাবাসজনিত মানসিক চাপের ফল?
বিশ্লেষকদের মতে, যারা বছরের পর বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের অংশ হিসেবে ক্ষমতা ও সুবিধা ভোগ করেছেন, বিরোধী মত দমন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারে যুক্ত ছিলেন—তাদের জন্য কারাগারের একঘেয়ে, নিয়ন্ত্রণহীন জীবন মানসিকভাবে আরও বেশি বিধ্বংসী হয়ে উঠছে।
তবে কেবল মানসিক চাপই নয়, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা অবহেলা ও প্রশাসনিক উদাসীনতা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুর রহমান মিয়া তার উদাহরণ। ৮১ বছর বয়সী এই নেতা ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে কারাগারেই মারা যান। একইভাবে সাবেক শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে নেওয়া হলেও অনেকের মতে, সময়মতো চিকিৎসা পেলে তার জীবন রক্ষা সম্ভব ছিল।
সব মৃত্যুই যে বার্ধক্যজনিত—এমন দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন, গাইবান্ধা জেলা কারাগারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ৫৫ বছর বয়সী তারিক রিফাত যেদিন আটক হন, সেদিনই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু ঘটে।
এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রিমান্ডে নেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান ৪৩ বছর বয়সী ওয়াসিকুর রহমান বাবু, যিনি বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে বলা আছে—রাষ্ট্র কাউকে হেফাজতে রাখলে তার জীবন ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত ভূমিকা যাই হোক না কেন, কারা হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ফ্যাসিবাদী শাসনের সুবিধাভোগীদের বিচারের পাশাপাশি কারাগারে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশোধ, অবহেলা কিংবা অমানবিক আচরণ যেন না ঘটে—তা নিশ্চিত করাও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরীক্ষার জায়গা।
কারাগারে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন তাই শুধু দায় নয়—
এই মৃত্যু কি আইনের ব্যর্থতা, নাকি ক্ষমতার পতনের পর মানসিক ও শারীরিক ভাঙনের করুণ পরিণতি?
📰 আরও খবর জানতে ভিজিট করুন:
www.shadinpratidin.com
💬 মতামত দিন | 🔁 বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন