
বিশেষ প্রতিবেদক | আজাদুল হক আজাদ
খালেদা জিয়া—এই নামটি আজ শোকের, কিন্তু এই নামের শক্তিই আগামীর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর বিদায় কোনো সাধারণ প্রস্থান নয়; এটি একটি দীর্ঘ, সংঘাতপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি ছিলেন আমাদের প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক আলোর দিশারী—যাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হতো জনগণের আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে সরল, অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষ্য।
১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর এক বক্তৃতা পরদিন দেশের প্রায় সব পত্রিকার শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছিল—
“ওদের হাতে গোলামীর জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।”
এই একটি বাক্যেই তিনি ধরতে পেরেছিলেন একটি জাতির ভয়, স্বপ্ন ও রাজনৈতিক চেতনাকে। বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক নেতা এত সহজ অথচ গভীরভাবে জাতির সম্মিলিত আশঙ্কা ও প্রত্যাশাকে ভাষা দিতে পেরেছেন—এমন উদাহরণ বিরল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে মৌলিক শঙ্কাগুলোর একটি হলো—দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা একদিন বহিঃপ্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করবে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৃঢ়তার কেন্দ্রে ছিল এই প্রশ্নটি। তিনি ছিলেন আপসহীন, অবিচল; সময়ের ঝড়েও পাহাড়সম অটল। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছিল এই পরিচ্ছন্ন ও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি।
খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিল তাঁর বন্দিজীবন। তিনি সুস্থ অবস্থায় কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন; বের হয়েছিলেন মৃত্যু-পথযাত্রী হয়ে। তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এমন মামলায়, যা উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ, বসবাসের অনুপযোগী কারাগারে আটক, দীর্ঘদিন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা—এই সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল নিরব, কিন্তু গভীর এক নিপীড়নের দলিল।
তবু, এই বিদায় অশ্রু দিয়ে নয়—এই বিদায় জানাতে হয় বুকভরা গর্ব নিয়ে। তিনি ছিলেন একজন নারী, যিনি প্রতিকূল পরিবেশে নেতৃত্ব দিয়ে নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দেশের প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বৈরাচার, আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন লড়েছেন—এই লড়াই ছিল তাঁর অস্তিত্বের অংশ।
তাঁর পুত্র তারেক রহমানের ভাষায়—তিনি ছিলেন একদিকে আপসহীন দেশনেত্রী, অন্যদিকে পরিবারের জন্য মমতাময়ী অভিভাবক। দেশের জন্য তিনি হারিয়েছেন স্বামী, হারিয়েছেন সন্তান; ফলে এই দেশ, এই দেশের মানুষই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিবার। জনসেবা, ত্যাগ ও সংগ্রামের যে ইতিহাস তিনি রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ তাঁর বিদায়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। খালেদা জিয়া থাকবেন আমাদের রাজনৈতিক আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে। রাজনৈতিক দিকচেতনা হারালে, আমরা আবারও তাকাবো তাঁর দিকেই—দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন থাকার শিক্ষা নিতে।
একটি মহা জীবনের সমাপ্তি ঘটেছে বটে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব আগামীর প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।
মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও দেশবাসীকে এই কঠিন সময়ে ধৈর্য দান করুন।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন:
www.shadinpratidin.com
💬 মতামত দিন 🔁 বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন